এল টি কে নিউজ

প্রতিশ্রুত_ভূমি: ধর্মীয় আখ্যান থেকে দখল-রাজনীতির হাতিয়ার।



প্রতিশ্রুত_ভূমি: ধর্মীয় আখ্যান থেকে দখল-রাজনীতির হাতিয়ার।
‘প্রতিশ্রুত ভূমির মানচিত্র’ তথা গ্রেটার ইজরায়েল/বৃহত্তর ইসরায়েলের মানচিত্র।

"প্রতিশ্রুত ভূমি” কথাটি শুনলেই অনেকে এমনভাবে কথা বলেন, যেন এটি নিছক ধর্মীয় বিশ্বাসের বিষয়—রাজনীতির সঙ্গে যার কোনো সম্পর্ক নেই। এটাই সবচেয়ে বড় ভণিতা। জেনেসিস ১৫:১৮-এ আব্রাহামের বংশধরদের জন্য “মিশরের ওয়াদি/নদী” থেকে ইউফ্রেটিস পর্যন্ত ভূমির প্রতিশ্রুতির কথা আছে। ইতিহাসে এই ধর্মীয় আখ্যানকে বহুবার রাজনৈতিক দাবি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে; আর রিভিশনিস্ট জায়নবাদের ধারায় ভ্লাদিমির জাবোটিনস্কি প্রকাশ্যেই জর্ডান নদীর উভয় তীরজুড়ে ইহুদি রাষ্ট্রের কথা বলেছিলেন। অর্থাৎ, “প্রতিশ্রুত ভূমি” কখনোই শুধু আধ্যাত্মিক শব্দ ছিল না; এটি দীর্ঘদিন ধরেই ভূখণ্ড-রাজনীতির ভাষায় অনূদিত হয়ে আসছে। 

আজ যারা বলেন, “এসব কেবল ধর্মগ্রন্থের কথা”, তারা ইচ্ছাকৃতভাবে বর্তমানকে আড়াল করেন। কারণ মাটির বাস্তবতা অন্য কথা বলছে। ২০২৪ সালের নভেম্বরে ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচ পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি “সার্বভৌমত্ব” এগিয়ে নেওয়ার কথা বলেন। ২০২৫ সালের মে মাসে ইসরায়েল পশ্চিম তীরে ২২টি নতুন বসতি অনুমোদন করে। আগস্ট ২০২৫-এ E1 প্রকল্পের চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়—যা পশ্চিম তীরকে খণ্ডিত করে এবং পূর্ব জেরুজালেমের সঙ্গে তার ভৌগোলিক সংযোগ আরও দুর্বল করতে পারে। কাজেই “প্রতিশ্রুত ভূমি”র ভাষা এখন শুধু মঞ্চের বক্তৃতায় নেই; তা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, মানচিত্র, রাস্তা, বসতি ও কাঁটাতারের ভেতর ঢুকে গেছে। 

এখানেই সবচেয়ে কঠিন সত্যটি আছে: ধর্মীয় প্রতিশ্রুতি যখন আধুনিক রাষ্ট্রশক্তির হাতে পড়ে, তখন তা খুব সহজেই দখলের নৈতিক অজুহাতে পরিণত হয়। আন্তর্জাতিক মহল দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিম তীরের বসতিগুলোকে আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী বলে সমালোচনা করছে, আর ২০২৫ ও ২০২৬ সালের জাতিসংঘ-ভিত্তিক রিপোর্টগুলো বলছে বসতি সম্প্রসারণ, সহিংসতা ও বাস্তুচ্যুতি বেড়েছে। মার্চ ২০২৬-এ রয়টার্স-উদ্ধৃত জাতিসংঘের তথ্যে বলা হয়, এক বছরে পশ্চিম তীরে ৩৬ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং সংযুক্তিকরণের গতি ত্বরান্বিত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। যারা এখনো এই প্রক্রিয়াকে শুধু “নিরাপত্তা” বা “ঐতিহাসিক অধিকার” বলে ঢাকতে চান, তারা মূলত দখলকে ভাষাগত মেকআপ পরাচ্ছেন। 


সবচেয়ে বড় প্রতারণা হলো, কেউ একজন পুরো অঞ্চলজুড়ে ভয়াবহ মানচিত্র দেখিয়ে আতঙ্ক ছড়ায়, আর আরেকজন বলে—“দেখুন, এসবের তো কোনো সরকারি মানচিত্র নেই, তাই উদ্বেগের কিছু নেই।” এই দুই অবস্থানই বিভ্রান্তিকর। সত্যটা মাঝখানে নয়, বরং মাটির ওপর। আজ যে জায়গাগুলো সবচেয়ে সরাসরি চাপে আছে, সেগুলো হলো পশ্চিম তীর, পূর্ব জেরুজালেম এবং অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড। ধর্মীয় ভাষা যত দূরেই যাক, বাস্তব প্রকল্প এখন এই ভূখণ্ডগুলোকেই বদলে দিচ্ছে। প্রশ্ন তাই “মানচিত্রে কতদূর” নয়; প্রশ্ন হলো, “কার জমিতে, কার ঘরে, কার ভবিষ্যতে” সেই কল্পনার প্রয়োগ হচ্ছে। 

সুতরাং “প্রতিশ্রুত ভূমি”কে নিরীহ ধর্মীয় শব্দ হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার সময় শেষ। যখন কোনো ধর্মীয় আখ্যান মানুষের বাস্তব জমি, অধিকার ও রাষ্ট্রত্বকে সংকুচিত করার হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন সেটি আর কেবল বিশ্বাস থাকে না—সেটি হয়ে ওঠে দখলের মতাদর্শ। আর দখল, যতই শাস্ত্রের ভাষায় লেখা হোক, দখলই থাকে। 

আপনার মতামত লিখুন

এল টি কে নিউজ

সোমবার, ২৩ মার্চ ২০২৬


প্রতিশ্রুত_ভূমি: ধর্মীয় আখ্যান থেকে দখল-রাজনীতির হাতিয়ার।

প্রকাশের তারিখ : ২৩ মার্চ ২০২৬

featured Image

"প্রতিশ্রুত ভূমি” কথাটি শুনলেই অনেকে এমনভাবে কথা বলেন, যেন এটি নিছক ধর্মীয় বিশ্বাসের বিষয়—রাজনীতির সঙ্গে যার কোনো সম্পর্ক নেই। এটাই সবচেয়ে বড় ভণিতা। জেনেসিস ১৫:১৮-এ আব্রাহামের বংশধরদের জন্য “মিশরের ওয়াদি/নদী” থেকে ইউফ্রেটিস পর্যন্ত ভূমির প্রতিশ্রুতির কথা আছে। ইতিহাসে এই ধর্মীয় আখ্যানকে বহুবার রাজনৈতিক দাবি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে; আর রিভিশনিস্ট জায়নবাদের ধারায় ভ্লাদিমির জাবোটিনস্কি প্রকাশ্যেই জর্ডান নদীর উভয় তীরজুড়ে ইহুদি রাষ্ট্রের কথা বলেছিলেন। অর্থাৎ, “প্রতিশ্রুত ভূমি” কখনোই শুধু আধ্যাত্মিক শব্দ ছিল না; এটি দীর্ঘদিন ধরেই ভূখণ্ড-রাজনীতির ভাষায় অনূদিত হয়ে আসছে। 

আজ যারা বলেন, “এসব কেবল ধর্মগ্রন্থের কথা”, তারা ইচ্ছাকৃতভাবে বর্তমানকে আড়াল করেন। কারণ মাটির বাস্তবতা অন্য কথা বলছে। ২০২৪ সালের নভেম্বরে ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচ পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি “সার্বভৌমত্ব” এগিয়ে নেওয়ার কথা বলেন। ২০২৫ সালের মে মাসে ইসরায়েল পশ্চিম তীরে ২২টি নতুন বসতি অনুমোদন করে। আগস্ট ২০২৫-এ E1 প্রকল্পের চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়—যা পশ্চিম তীরকে খণ্ডিত করে এবং পূর্ব জেরুজালেমের সঙ্গে তার ভৌগোলিক সংযোগ আরও দুর্বল করতে পারে। কাজেই “প্রতিশ্রুত ভূমি”র ভাষা এখন শুধু মঞ্চের বক্তৃতায় নেই; তা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, মানচিত্র, রাস্তা, বসতি ও কাঁটাতারের ভেতর ঢুকে গেছে। 

এখানেই সবচেয়ে কঠিন সত্যটি আছে: ধর্মীয় প্রতিশ্রুতি যখন আধুনিক রাষ্ট্রশক্তির হাতে পড়ে, তখন তা খুব সহজেই দখলের নৈতিক অজুহাতে পরিণত হয়। আন্তর্জাতিক মহল দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিম তীরের বসতিগুলোকে আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী বলে সমালোচনা করছে, আর ২০২৫ ও ২০২৬ সালের জাতিসংঘ-ভিত্তিক রিপোর্টগুলো বলছে বসতি সম্প্রসারণ, সহিংসতা ও বাস্তুচ্যুতি বেড়েছে। মার্চ ২০২৬-এ রয়টার্স-উদ্ধৃত জাতিসংঘের তথ্যে বলা হয়, এক বছরে পশ্চিম তীরে ৩৬ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং সংযুক্তিকরণের গতি ত্বরান্বিত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। যারা এখনো এই প্রক্রিয়াকে শুধু “নিরাপত্তা” বা “ঐতিহাসিক অধিকার” বলে ঢাকতে চান, তারা মূলত দখলকে ভাষাগত মেকআপ পরাচ্ছেন। 


সবচেয়ে বড় প্রতারণা হলো, কেউ একজন পুরো অঞ্চলজুড়ে ভয়াবহ মানচিত্র দেখিয়ে আতঙ্ক ছড়ায়, আর আরেকজন বলে—“দেখুন, এসবের তো কোনো সরকারি মানচিত্র নেই, তাই উদ্বেগের কিছু নেই।” এই দুই অবস্থানই বিভ্রান্তিকর। সত্যটা মাঝখানে নয়, বরং মাটির ওপর। আজ যে জায়গাগুলো সবচেয়ে সরাসরি চাপে আছে, সেগুলো হলো পশ্চিম তীর, পূর্ব জেরুজালেম এবং অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড। ধর্মীয় ভাষা যত দূরেই যাক, বাস্তব প্রকল্প এখন এই ভূখণ্ডগুলোকেই বদলে দিচ্ছে। প্রশ্ন তাই “মানচিত্রে কতদূর” নয়; প্রশ্ন হলো, “কার জমিতে, কার ঘরে, কার ভবিষ্যতে” সেই কল্পনার প্রয়োগ হচ্ছে। 

সুতরাং “প্রতিশ্রুত ভূমি”কে নিরীহ ধর্মীয় শব্দ হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার সময় শেষ। যখন কোনো ধর্মীয় আখ্যান মানুষের বাস্তব জমি, অধিকার ও রাষ্ট্রত্বকে সংকুচিত করার হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন সেটি আর কেবল বিশ্বাস থাকে না—সেটি হয়ে ওঠে দখলের মতাদর্শ। আর দখল, যতই শাস্ত্রের ভাষায় লেখা হোক, দখলই থাকে। 


এল টি কে নিউজ

সম্পাদক ও প্রকাশক: মাসুদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত এল টি কে নিউজ