বাংলাদেশের অপরাধ ইতিহাসে “রসু খাঁ” নামটি এক ভয়ঙ্কর অধ্যায়ের প্রতীক। দেশের প্রথম চিহ্নিত ধারাবাহিক খুনি হিসেবে পরিচিত এই ব্যক্তি ২০০৯ সালের অক্টোবরে গ্রেপ্তার হওয়ার পর একে একে যেসব তথ্য প্রকাশ পায়, তা পুরো দেশকে আতঙ্কিত ও স্তম্ভিত করেছিল। বিশেষ করে দরিদ্র ও অসহায় নারী পোশাকশ্রমিকদের লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে যে নৃশংস কায়দায় সে হত্যাকাণ্ড চালাত, তা বাংলাদেশের অপরাধ জগতের ইতিহাসে এক বিরল ও শিউরে ওঠার মতো ঘটনা।
চাঁদপুরের এই কুখ্যাত অপরাধী টঙ্গী ও সাভার এলাকার সাধারণ নারী পোশাকশ্রমিকদের প্রেমের সম্পর্কের প্রলোভনে ফাঁদে ফেলত। পরে তাদের চাঁদপুরের নির্জন চরে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করত এবং হাত-পা বেঁধে শ্বাসরোধ করে হত্যা করত। তদন্তে উঠে আসে, সে একই কৌশলে অন্তত ১১ জন নারীকে হত্যা করেছে। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে রসু খাঁ এসব হত্যাকাণ্ডের স্বীকারোক্তিও দেয়।
এই হত্যাকাণ্ডগুলো শুধু কয়েকটি পরিবারের স্বপ্ন ধ্বংস করেনি; বরং সমাজে নারীদের নিরাপত্তা নিয়েও বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছিল। নিহতদের বেশিরভাগই ছিলেন নিম্নআয়ের শ্রমজীবী নারী, যাদের হারিয়ে যাওয়ার ঘটনাগুলো প্রথমে তেমন গুরুত্ব পায়নি। কিন্তু একের পর এক লাশ উদ্ধারের পর তদন্তকারীরা বুঝতে পারেন, এর পেছনে রয়েছে এক ভয়ংকর ধারাবাহিক হত্যাকারী।
দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ার পর ২০১৫ সালের ২২ এপ্রিল শাহিদা হত্যা মামলায় চাঁদপুরের আদালত প্রথমবারের মতো রসু খাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেন। পরে ২০১৮ সালে পারভীন হত্যা মামলাতেও তার বিরুদ্ধে ফাঁসির আদেশ আসে। সর্বশেষ ২০২৪ সালের জুলাই মাসে দেশের উচ্চ আদালতও সেই মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন। অর্থাৎ বিচারিক প্রক্রিয়ায় রসু খাঁর অপরাধ এবং তার শাস্তি নিয়ে আদালতের অবস্থান স্পষ্ট।
তবে প্রশ্ন উঠছে অন্য জায়গায়। প্রথম মৃত্যুদণ্ড ঘোষণার পর পেরিয়ে গেছে এক দশকেরও বেশি সময়। গ্রেপ্তারের পর কেটে গেছে প্রায় ১৭ বছর। তারপরও এখনো তার ফাঁসি কার্যকর হয়নি। ডেথ রেফারেন্স, আপিল ও আইনি জটিলতার কারণে বছরের পর বছর ধরে মামলাটি ঝুলে আছে। ফলে একদিকে যেমন ভুক্তভোগী পরিবারগুলো ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় ক্লান্ত, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের মাঝেও বিচারব্যবস্থা নিয়ে হতাশা তৈরি হয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন চিহ্নিত সিরিয়াল কিলারের শাস্তি কার্যকর করতে এত দীর্ঘ সময় লাগা বিচার ব্যবস্থার দুর্বলতারই প্রতিফলন। তারা মনে করেন, আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও বিচারিক কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন না হলে অপরাধীদের মধ্যে শাস্তি এড়িয়ে যাওয়ার মানসিকতা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে ভয়াবহ ও বহুল আলোচিত অপরাধের ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা জনগণের বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থা কমিয়ে দেয়।
মানবাধিকার ও ন্যায়বিচারের প্রশ্নে অবশ্য মৃত্যুদণ্ড নিয়ে বিশ্বব্যাপী বিতর্ক রয়েছে। তবে বাংলাদেশের বাস্তবতায় বহু মানুষ মনে করেন, রসু খাঁর মতো নৃশংস অপরাধীর দ্রুত শাস্তি কার্যকর হওয়া উচিত ছিল। কারণ এমন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ভবিষ্যতের অপরাধীদের জন্য কঠোর বার্তা বহন করতে পারে।
আজও নিহত ১১ নারীর পরিবার ন্যায়বিচারের পূর্ণ বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছে। তাদের প্রশ্ন—যদি আদালত একাধিকবার মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখে, তবে সেই রায় কার্যকর হতে এত বছর কেন লাগবে? এই প্রশ্ন শুধু একটি মামলার নয়; এটি বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা, গতি ও জবাবদিহিতা নিয়েও বড় এক সামাজিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
রসু খাঁর ঘটনা তাই কেবল একজন সিরিয়াল কিলারের গল্প নয়; এটি বিচার বিলম্ব, আইনি জটিলতা এবং ভুক্তভোগীদের দীর্ঘ অপেক্ষার এক নির্মম প্রতিচ্ছবি। বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা যদি জনগণের আস্থা ধরে রাখতে চায়, তবে এমন আলোচিত মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি ও রায় বাস্তবায়নের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া সময়ের দাবি।
বিষয় : অপরাধ বিচার বিচার ব্যবস্থা আইন

শনিবার, ২৩ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২২ মে ২০২৬
বাংলাদেশের অপরাধ ইতিহাসে “রসু খাঁ” নামটি এক ভয়ঙ্কর অধ্যায়ের প্রতীক। দেশের প্রথম চিহ্নিত ধারাবাহিক খুনি হিসেবে পরিচিত এই ব্যক্তি ২০০৯ সালের অক্টোবরে গ্রেপ্তার হওয়ার পর একে একে যেসব তথ্য প্রকাশ পায়, তা পুরো দেশকে আতঙ্কিত ও স্তম্ভিত করেছিল। বিশেষ করে দরিদ্র ও অসহায় নারী পোশাকশ্রমিকদের লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে যে নৃশংস কায়দায় সে হত্যাকাণ্ড চালাত, তা বাংলাদেশের অপরাধ জগতের ইতিহাসে এক বিরল ও শিউরে ওঠার মতো ঘটনা।
চাঁদপুরের এই কুখ্যাত অপরাধী টঙ্গী ও সাভার এলাকার সাধারণ নারী পোশাকশ্রমিকদের প্রেমের সম্পর্কের প্রলোভনে ফাঁদে ফেলত। পরে তাদের চাঁদপুরের নির্জন চরে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করত এবং হাত-পা বেঁধে শ্বাসরোধ করে হত্যা করত। তদন্তে উঠে আসে, সে একই কৌশলে অন্তত ১১ জন নারীকে হত্যা করেছে। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে রসু খাঁ এসব হত্যাকাণ্ডের স্বীকারোক্তিও দেয়।
এই হত্যাকাণ্ডগুলো শুধু কয়েকটি পরিবারের স্বপ্ন ধ্বংস করেনি; বরং সমাজে নারীদের নিরাপত্তা নিয়েও বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছিল। নিহতদের বেশিরভাগই ছিলেন নিম্নআয়ের শ্রমজীবী নারী, যাদের হারিয়ে যাওয়ার ঘটনাগুলো প্রথমে তেমন গুরুত্ব পায়নি। কিন্তু একের পর এক লাশ উদ্ধারের পর তদন্তকারীরা বুঝতে পারেন, এর পেছনে রয়েছে এক ভয়ংকর ধারাবাহিক হত্যাকারী।
দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ার পর ২০১৫ সালের ২২ এপ্রিল শাহিদা হত্যা মামলায় চাঁদপুরের আদালত প্রথমবারের মতো রসু খাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেন। পরে ২০১৮ সালে পারভীন হত্যা মামলাতেও তার বিরুদ্ধে ফাঁসির আদেশ আসে। সর্বশেষ ২০২৪ সালের জুলাই মাসে দেশের উচ্চ আদালতও সেই মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন। অর্থাৎ বিচারিক প্রক্রিয়ায় রসু খাঁর অপরাধ এবং তার শাস্তি নিয়ে আদালতের অবস্থান স্পষ্ট।
তবে প্রশ্ন উঠছে অন্য জায়গায়। প্রথম মৃত্যুদণ্ড ঘোষণার পর পেরিয়ে গেছে এক দশকেরও বেশি সময়। গ্রেপ্তারের পর কেটে গেছে প্রায় ১৭ বছর। তারপরও এখনো তার ফাঁসি কার্যকর হয়নি। ডেথ রেফারেন্স, আপিল ও আইনি জটিলতার কারণে বছরের পর বছর ধরে মামলাটি ঝুলে আছে। ফলে একদিকে যেমন ভুক্তভোগী পরিবারগুলো ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় ক্লান্ত, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের মাঝেও বিচারব্যবস্থা নিয়ে হতাশা তৈরি হয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন চিহ্নিত সিরিয়াল কিলারের শাস্তি কার্যকর করতে এত দীর্ঘ সময় লাগা বিচার ব্যবস্থার দুর্বলতারই প্রতিফলন। তারা মনে করেন, আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও বিচারিক কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন না হলে অপরাধীদের মধ্যে শাস্তি এড়িয়ে যাওয়ার মানসিকতা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে ভয়াবহ ও বহুল আলোচিত অপরাধের ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা জনগণের বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থা কমিয়ে দেয়।
মানবাধিকার ও ন্যায়বিচারের প্রশ্নে অবশ্য মৃত্যুদণ্ড নিয়ে বিশ্বব্যাপী বিতর্ক রয়েছে। তবে বাংলাদেশের বাস্তবতায় বহু মানুষ মনে করেন, রসু খাঁর মতো নৃশংস অপরাধীর দ্রুত শাস্তি কার্যকর হওয়া উচিত ছিল। কারণ এমন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ভবিষ্যতের অপরাধীদের জন্য কঠোর বার্তা বহন করতে পারে।
আজও নিহত ১১ নারীর পরিবার ন্যায়বিচারের পূর্ণ বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছে। তাদের প্রশ্ন—যদি আদালত একাধিকবার মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখে, তবে সেই রায় কার্যকর হতে এত বছর কেন লাগবে? এই প্রশ্ন শুধু একটি মামলার নয়; এটি বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা, গতি ও জবাবদিহিতা নিয়েও বড় এক সামাজিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
রসু খাঁর ঘটনা তাই কেবল একজন সিরিয়াল কিলারের গল্প নয়; এটি বিচার বিলম্ব, আইনি জটিলতা এবং ভুক্তভোগীদের দীর্ঘ অপেক্ষার এক নির্মম প্রতিচ্ছবি। বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা যদি জনগণের আস্থা ধরে রাখতে চায়, তবে এমন আলোচিত মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি ও রায় বাস্তবায়নের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া সময়ের দাবি।

আপনার মতামত লিখুন