মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি হস্তক্ষেপে তিনদিনের যুদ্ধবিরতিতে রয়েছে রাশিয়া ও ইউক্রেন। এই যুদ্ধে ইউক্রেন-রাশিয়া ছাড়াও বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের যুদ্ধ করতে বাধ্য করা হয়েছে বলে জোরালো অভিযোগ রয়েছে। যুদ্ধ করতে বাধ্য হয়েছেন বহু বাংলাদেশিও, প্রাণও হারিয়েছেন। অনেকে যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকে পালাতে সক্ষমও হয়েছেন। তেমনি একজন মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ার মোহন মিয়াজী।
প্রায় বছর দুয়েক আগে ফেসবুকে রাশিয়ায় কাজের বিজ্ঞাপন দেখে লোভে পড়ে যান মোহন। প্রায় ৫ গুণ বেশি আয়ের অফারটি লুফে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন পেশায় ইলেকট্রিশিয়ান মোহন। ভালো উপার্জনের আশায় খুশিমনে রাশিয়া পৌঁছালেন তিনি। প্রথমে পূর্ব রাশিয়ার সোবোডনি এলাকায় ইলেকট্রনিক্সের কাজ শুরু করেন। যদিও সেখানে তাপমাত্রা ছিল হিমাঙ্কের ২০ ডিগ্রি নিচে।
কিন্তু, এর পাঁচ মাস পর তার সামনে আসে এক নতুন বাস্তবতা। রাশিয়ার হয়ে ইউক্রেন যুদ্ধে তাকে সম্মুখ সমরের সৈনিক হতে বাধ্য করা হয়। মোহনের রাশিয়া যাওয়া থেকে শুরু করে, যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা ও বাংলাদেশে ফিরে আসা নিয়ে শনিবার (০৯ মে) একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ। সাংবাদিক টম পেরি গজারিয়া এসে মোহনের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন।
মোহন জানান, তিনি ও তার সহকর্মীদের যখন ইউক্রেনে রাশিয়ার অধিকৃত দোনেৎস্কের একটি সেনাশিবিরে পাঠানো হয়, তখন সেখানকার কমান্ডার তাকে জানান, তিনি তাদের ব্যাটালিয়নে যোগদানের চুক্তিতে সই করেছেন।
টেলিগ্রাফকে মোহন বলেন, ‘আমি কমান্ডারকে নিয়োগকারী সংস্থার দেওয়া কাগজ দেখালাম। সেখানে লেখা ছিল, আমরা কোনো যুদ্ধে জড়াব না। তখন তিনি আমাকে বললেন, আমাকে আসলে প্রতারিত করা হয়েছে।’
তিনি জানান, দোনেৎস্কে ভয়াবহ ড্রোন হামলা হতো। তখন তাদের বরফে ঢাকা ট্রেঞ্চে আশ্রয় নিতে হতো।
মোহন বলেন, ‘ধ্বংসপ্রাপ্ত ইউক্রেনীয় শহর আভদিভকাতে আমাদের পাঠানো হয়েছিল। সেখানে ভয়াবহ যুদ্ধের মধ্যে পড়ি। কামানের গোলার স্প্লিন্টারের আঘাতে আমি নিজে আহত হই। সেখানে মাইন বিস্ফোরণে বন্ধুকে নিহত হতে দেখেছি।’
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ শুরুর পরেই শোনা যায় ভাড়াটে সৈনিকের কথা। চাকরির বিজ্ঞাপনসহ নানা কৌশলে শত শত বিদেশিকে প্রলুব্ধ করে যুদ্ধের ময়দানে পাঠায় দুই দেশই।
মোহন জানান, তাদের ইউনিটে আরও কয়েকজন বাংলাদেশি ছিলেন। ওই ইউনিটে রুশ যোদ্ধাও ছিল। ইউনিটটিকে প্রতিদিনই যুদ্ধ করতে হতো।
তিনি জানান, রুশ কমান্ডাররা বেতন চুরি করত এবং প্রতিবাদ করলে রাইফেলের বাট দিয়ে পেটানো হতো। ভুল করলে মাটির নিচে নিয়ে নির্যাতন করা হতো। অনেক সময় বিবস্ত্র করে সিলিং থেকে উল্টো করে ঝুলিয়ে রাখা হতো।
তিনি বলেন, ‘আমি বুঝতে পারছিলাম, আটকা পড়ে গেছি। পালানোর কোনো পথ ছিল না। প্রতিটা সেকেন্ড আতঙ্কে থাকতাম, মনে হতো কখন যে প্রাণ চলে যায়।’
তবে মোহন যুদ্ধক্ষেত্রে থাকার কারণে কী পরিমাণ অর্থ পেয়েছেন বা আদৌ কোনো অর্থ পেয়েছেন কি-না অথবা পেলে সেই অর্থ দেশে পাঠাতে পেরেছেন কি-না; সেই বিষয়ে এই সাক্ষাৎকারে কিছু জানানো হয়নি।
তিনি জানান, রাশিয়া পৌঁছানোর পর কমান্ডারদের পক্ষে এক রুশ এজেন্ট প্রথমে তাকে উন্নত জায়গায় কাজের প্রলোভন দেখান। কর্মস্থলটি যুদ্ধের ময়দান থেকে দূরে বলেও জানানো হয়েছে।
কিন্তু, তাদের রোস্তভ-অন-ডনের একটি সামরিক ঘাঁটিতে ৩ সপ্তাহের মৌলিক প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানো হয়।
মোহন বলেন, ‘যদিও আমাকে বলা হয়েছিল সম্মুখ সমরে থাকব না। কিন্তু আমাকে অ্যাসল্ট রাইফেল ব্যবহার, আরপিজি ফায়ার ও গ্রেনেড নিক্ষেপের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। তারা যখন বলেছিল এটা প্রশিক্ষণের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। আমি তখন তাদের বিশ্বাস করেছিলাম।
দীর্ঘ প্রায় আট মাসের দুঃসহ যন্ত্রণার পর ২০২৫ সালের শেষে সংক্ষিপ্ত ছুটি পেয়ে মোহন মস্কোতে পৌঁছাতে সক্ষম হন। সেখানে থাকাকালে তিনি বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে অস্থায়ী ভ্রমণ নথিপত্র (ট্রাভেল পারমিট) সংগ্রহ করেন। তার পাসপোর্ট আগেই সামরিক বাহিনী কেড়ে নিয়েছিল।
তিনি বলেন, ‘বিমানবন্দরে আমাকে নিরাপত্তা কর্মীরা আলাদা করে নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আমি শেষ পর্যন্ত উড়োজাহাজে উঠতে পারি। আমি ভেবেছিলাম তারা আমাকে আটকে দেবে। শেষ পর্যন্ত যখন দেশে পরিবারের কাছে ফিরে এলাম, আমার মা নির্বাক হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন, আমাকে হয়ত আর কোনোদিন দেখতে পাবেন না। দুজন-দুজনকে জড়িয়ে ধরে কাঁদলাম।’
বর্তমানে মুন্সিগঞ্জে ভাইয়ের বাড়িতে থাকেন মোহন। টেলিগ্রাফের কাছে তিনি স্বীকার করেন, রাশিয়া যাওয়াটা তার বোকামি ছিল।
আপনার মতামত লিখুন