মানব মহাকাশ অভিযানের ইতিহাসে আর্টেমিস–২ এক নতুন মাইলফলক। নাসার তথ্য অনুযায়ী, এই মিশনের নভোচারীরা চাঁদের ফ্লাইবাইয়ের সময় পৃথিবী থেকে সর্বোচ্চ ২,৫২,৭৬০ মাইল দূরে পৌঁছাবেন, যা অ্যাপোলো ১৩–এর আগের মানব-দূরত্ব রেকর্ডের চেয়েও প্রায় ৪,১০৫ মাইল বেশি। নাসা বলছে, এই রেকর্ড ভাঙার মুহূর্তটি যুক্তরাষ্ট্রের ৬ এপ্রিল দুপুর ১:৫৬ মিনিট Eastern Time, যা বাংলাদেশ সময় ৬ এপ্রিল রাত ১১:৫৬ মিনিট।
তবে এই গৌরবময় যাত্রার মাঝেই আসবে এক অদ্ভুত নীরবতা। নাসার ফ্লাইট ডে–৫ আপডেট অনুযায়ী, সব সময় Eastern Time-এ দেওয়া, এবং সেই সূচি অনুযায়ী ৬ এপ্রিল সন্ধ্যা ৬:৪৪ মিনিটে মিশন কন্ট্রোল সাময়িকভাবে ক্রুর সঙ্গে যোগাযোগ হারাবে। বাংলাদেশ সময়ে সেটি দাঁড়ায় ৭ এপ্রিল ভোর ৪:৪৪ মিনিট। নাসা আরও জানিয়েছে, ওরিয়ন যখন চাঁদের পেছনে চলে যাবে, তখন চাঁদের পৃষ্ঠই রেডিও সিগন্যালের পথ আটকে দেবে; ফলে পৃথিবী থেকে পাঠানো কিংবা পৃথিবীতে ফেরত আসা কোনো সিগন্যালই তখন স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতে পারবে না।
অর্থাৎ এটি কোনো প্রযুক্তিগত ত্রুটি নয়, বরং একেবারেই পরিকল্পিত যোগাযোগ-ব্ল্যাকআউট। নাসার “Networks Keeping NASA’s Artemis II Mission Connected” প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ব্ল্যাকআউটের স্থায়িত্ব হবে আনুমানিক ৪১ মিনিট। কারণ, বর্তমানে আর্টেমিস–২ মূলত পৃথিবীভিত্তিক যোগাযোগ অবকাঠামো—বিশেষ করে Deep Space Network—এর ওপর নির্ভর করছে। পৃথিবী, চাঁদ ও মহাকাশযান এক সরলরেখায় না থাকলে এই নেটওয়ার্ক সিগন্যাল ধরে রাখতে পারে না। ওরিয়ন চাঁদের আড়াল থেকে বেরিয়ে এলে আবার সিগন্যাল ধরা পড়বে এবং হিউস্টনের মিশন কন্ট্রোলের সঙ্গে যোগাযোগ পুনঃস্থাপিত হবে।
বাংলাদেশ সময় ধরে দেখলে ঘটনাপ্রবাহটি হবে আরও নাটকীয়। ভোর ৪:৪৫ মিনিটে নভোচারীদের চোখে ঘটবে “Earthset”—অর্থাৎ পৃথিবী চাঁদের আড়ালে সরে যেতে দেখা যাবে। ভোর ৫:০২ মিনিটে ওরিয়ন চাঁদের সবচেয়ে কাছাকাছি পৌঁছাবে, প্রায় ৪,০৭০ মাইল ওপরে। এরপর ভোর ৫:০৭ মিনিটে মহাকাশযান মিশনের সর্বোচ্চ দূরত্বে পৌঁছাবে। আর ভোর ৫:২৫ মিনিটে ঘটবে “Earthrise”—চাঁদের উল্টো প্রান্ত থেকে আবার পৃথিবী চোখে পড়বে, এবং একই সময়ে মিশন কন্ট্রোলও পুনরায় যোগাযোগ ফিরে পাওয়ার কথা। নাসা সতর্ক করে বলেছে, রিয়েল-টাইম অপারেশনের কারণে এসব সময় কিছুটা পরিবর্তিত হতে পারে।
এখন প্রশ্ন হলো, এই নীরব সময়ে নভোচারীরা কী করবেন? নাসার ব্যাখ্যা বলছে, তারা নিষ্ক্রিয় থাকবেন না; বরং এই পর্যায়টি নিজেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক ও অপারেশনাল অধ্যায়। লুনার অবজারভেশন পিরিয়ড শুরু হয় যুক্তরাষ্ট্রের ৬ এপ্রিল বিকেল ২:৪৫–এ, যা বাংলাদেশ সময় ৭ এপ্রিল রাত ১২:৪৫ মিনিট। এই সাত ঘণ্টার পর্যবেক্ষণপর্বে ক্রুরা চাঁদের near side ও far side—দুই দিকই পর্যবেক্ষণ করবেন। জানালার জায়গা সীমিত হওয়ায় তারা দুই জোড়ায় ভাগ হয়ে কাজ করবেন: এক জোড়া ৫৫ থেকে ৮৫ মিনিট পর্যবেক্ষণ করবে, অন্য জোড়া তখন ব্যায়াম করবে বা অন্য কাজ করবে।
চাঁদের আড়ালে থাকা অবস্থায় তারা মূলত তিন ধরনের কাজ করবেন। প্রথমত, চাঁদের পৃষ্ঠ, গঠন, আলো-ছায়া ও বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য পর্যবেক্ষণ করবেন। নাসার মতে, মানুষের চোখ ও মস্তিষ্ক রঙ, টেক্সচার ও সূক্ষ্ম পৃষ্ঠগত পার্থক্য শনাক্ত করতে অত্যন্ত দক্ষ; তাই এই সরাসরি মানব-পর্যবেক্ষণ ভবিষ্যৎ চন্দ্রবিজ্ঞানের জন্য মূল্যবান হতে পারে। দ্বিতীয়ত, তারা মহাকাশযানের সিস্টেম পর্যবেক্ষণ করবেন—কারণ আর্টেমিস–২–এর বড় লক্ষ্যই হলো গভীর মহাশূন্যে মানুষের উপস্থিতিতে লাইফ-সাপোর্ট, প্রপালশন, পাওয়ার, থার্মাল, নেভিগেশন ও ক্রু ইন্টারফেস সিস্টেম কতটা কার্যকর, তা যাচাই করা। তৃতীয়ত, ব্ল্যাকআউট শেষে পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ ফিরে এলে তারা ধারণ করা ছবি ও পর্যবেক্ষণের অংশ মাটিতে পাঠানো শুরু করবেন।
এখানে আরেকটি বড় বিষয় হলো, ওরিয়ন কোনো দিশাহীন ভাসমান ক্যাপসুল নয়। নাসার ভিজ্যুয়ালাইজেশন অনুযায়ী, আর্টেমিস–২ একটি free-return trajectory অনুসরণ করছে, অর্থাৎ পৃথিবী ও চাঁদের মহাকর্ষকে ব্যবহার করে এমন একটি পথ, যা স্বাভাবিকভাবেই মহাকাশযানকে নিরাপদে পৃথিবীর দিকে ফিরিয়ে আনে। তাই যোগাযোগ না থাকলেও মিশন থেমে থাকে না; নির্ধারিত পথ ধরে ওরিয়ন এগিয়ে যেতে থাকে।
নাসা এটাও মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, এ ধরনের ব্ল্যাকআউট একেবারে নজিরবিহীন নয়। অ্যাপোলো যুগেও এমন ঘটনা ঘটেছে, আর আর্টেমিস–১–এও অনুরূপ যোগাযোগ-বিচ্ছিন্নতা দেখা গেছে। ভবিষ্যতে এই সীমাবদ্ধতা কাটাতে নাসা চাঁদের চারপাশে relay satellites বসানোর পরিকল্পনা করছে, যাতে চাঁদের পেছন দিকেও অবিচ্ছিন্ন যোগাযোগ রাখা যায়।
সব মিলিয়ে, আর্টেমিস–২–এর এই ‘নীরব ৪১ মিনিট’ আসলে ভয়ের গল্প নয়; এটি প্রযুক্তি, কক্ষপথবিদ্যা, এবং মানব প্রস্তুতির এক অসাধারণ পরীক্ষা। পৃথিবী তখন ছোট হয়ে যাবে, সিগন্যাল থেমে যাবে, কিন্তু মিশন থামবে না। বরং সেই নীরবতার মধ্য দিয়েই মানুষ আরও একবার প্রমাণ করবে—পৃথিবীর সীমানা ছাড়িয়ে যাওয়ার সাহস এখন আর কল্পকাহিনি নয়, বাস্তব বিজ্ঞান।
বিষয় : চন্দ্রাভিযান মহাকাশ আর্টেমিস-২ বিজ্ঞান

সোমবার, ০৬ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৬ এপ্রিল ২০২৬
মানব মহাকাশ অভিযানের ইতিহাসে আর্টেমিস–২ এক নতুন মাইলফলক। নাসার তথ্য অনুযায়ী, এই মিশনের নভোচারীরা চাঁদের ফ্লাইবাইয়ের সময় পৃথিবী থেকে সর্বোচ্চ ২,৫২,৭৬০ মাইল দূরে পৌঁছাবেন, যা অ্যাপোলো ১৩–এর আগের মানব-দূরত্ব রেকর্ডের চেয়েও প্রায় ৪,১০৫ মাইল বেশি। নাসা বলছে, এই রেকর্ড ভাঙার মুহূর্তটি যুক্তরাষ্ট্রের ৬ এপ্রিল দুপুর ১:৫৬ মিনিট Eastern Time, যা বাংলাদেশ সময় ৬ এপ্রিল রাত ১১:৫৬ মিনিট।
তবে এই গৌরবময় যাত্রার মাঝেই আসবে এক অদ্ভুত নীরবতা। নাসার ফ্লাইট ডে–৫ আপডেট অনুযায়ী, সব সময় Eastern Time-এ দেওয়া, এবং সেই সূচি অনুযায়ী ৬ এপ্রিল সন্ধ্যা ৬:৪৪ মিনিটে মিশন কন্ট্রোল সাময়িকভাবে ক্রুর সঙ্গে যোগাযোগ হারাবে। বাংলাদেশ সময়ে সেটি দাঁড়ায় ৭ এপ্রিল ভোর ৪:৪৪ মিনিট। নাসা আরও জানিয়েছে, ওরিয়ন যখন চাঁদের পেছনে চলে যাবে, তখন চাঁদের পৃষ্ঠই রেডিও সিগন্যালের পথ আটকে দেবে; ফলে পৃথিবী থেকে পাঠানো কিংবা পৃথিবীতে ফেরত আসা কোনো সিগন্যালই তখন স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতে পারবে না।
অর্থাৎ এটি কোনো প্রযুক্তিগত ত্রুটি নয়, বরং একেবারেই পরিকল্পিত যোগাযোগ-ব্ল্যাকআউট। নাসার “Networks Keeping NASA’s Artemis II Mission Connected” প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ব্ল্যাকআউটের স্থায়িত্ব হবে আনুমানিক ৪১ মিনিট। কারণ, বর্তমানে আর্টেমিস–২ মূলত পৃথিবীভিত্তিক যোগাযোগ অবকাঠামো—বিশেষ করে Deep Space Network—এর ওপর নির্ভর করছে। পৃথিবী, চাঁদ ও মহাকাশযান এক সরলরেখায় না থাকলে এই নেটওয়ার্ক সিগন্যাল ধরে রাখতে পারে না। ওরিয়ন চাঁদের আড়াল থেকে বেরিয়ে এলে আবার সিগন্যাল ধরা পড়বে এবং হিউস্টনের মিশন কন্ট্রোলের সঙ্গে যোগাযোগ পুনঃস্থাপিত হবে।
বাংলাদেশ সময় ধরে দেখলে ঘটনাপ্রবাহটি হবে আরও নাটকীয়। ভোর ৪:৪৫ মিনিটে নভোচারীদের চোখে ঘটবে “Earthset”—অর্থাৎ পৃথিবী চাঁদের আড়ালে সরে যেতে দেখা যাবে। ভোর ৫:০২ মিনিটে ওরিয়ন চাঁদের সবচেয়ে কাছাকাছি পৌঁছাবে, প্রায় ৪,০৭০ মাইল ওপরে। এরপর ভোর ৫:০৭ মিনিটে মহাকাশযান মিশনের সর্বোচ্চ দূরত্বে পৌঁছাবে। আর ভোর ৫:২৫ মিনিটে ঘটবে “Earthrise”—চাঁদের উল্টো প্রান্ত থেকে আবার পৃথিবী চোখে পড়বে, এবং একই সময়ে মিশন কন্ট্রোলও পুনরায় যোগাযোগ ফিরে পাওয়ার কথা। নাসা সতর্ক করে বলেছে, রিয়েল-টাইম অপারেশনের কারণে এসব সময় কিছুটা পরিবর্তিত হতে পারে।
এখন প্রশ্ন হলো, এই নীরব সময়ে নভোচারীরা কী করবেন? নাসার ব্যাখ্যা বলছে, তারা নিষ্ক্রিয় থাকবেন না; বরং এই পর্যায়টি নিজেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক ও অপারেশনাল অধ্যায়। লুনার অবজারভেশন পিরিয়ড শুরু হয় যুক্তরাষ্ট্রের ৬ এপ্রিল বিকেল ২:৪৫–এ, যা বাংলাদেশ সময় ৭ এপ্রিল রাত ১২:৪৫ মিনিট। এই সাত ঘণ্টার পর্যবেক্ষণপর্বে ক্রুরা চাঁদের near side ও far side—দুই দিকই পর্যবেক্ষণ করবেন। জানালার জায়গা সীমিত হওয়ায় তারা দুই জোড়ায় ভাগ হয়ে কাজ করবেন: এক জোড়া ৫৫ থেকে ৮৫ মিনিট পর্যবেক্ষণ করবে, অন্য জোড়া তখন ব্যায়াম করবে বা অন্য কাজ করবে।
চাঁদের আড়ালে থাকা অবস্থায় তারা মূলত তিন ধরনের কাজ করবেন। প্রথমত, চাঁদের পৃষ্ঠ, গঠন, আলো-ছায়া ও বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য পর্যবেক্ষণ করবেন। নাসার মতে, মানুষের চোখ ও মস্তিষ্ক রঙ, টেক্সচার ও সূক্ষ্ম পৃষ্ঠগত পার্থক্য শনাক্ত করতে অত্যন্ত দক্ষ; তাই এই সরাসরি মানব-পর্যবেক্ষণ ভবিষ্যৎ চন্দ্রবিজ্ঞানের জন্য মূল্যবান হতে পারে। দ্বিতীয়ত, তারা মহাকাশযানের সিস্টেম পর্যবেক্ষণ করবেন—কারণ আর্টেমিস–২–এর বড় লক্ষ্যই হলো গভীর মহাশূন্যে মানুষের উপস্থিতিতে লাইফ-সাপোর্ট, প্রপালশন, পাওয়ার, থার্মাল, নেভিগেশন ও ক্রু ইন্টারফেস সিস্টেম কতটা কার্যকর, তা যাচাই করা। তৃতীয়ত, ব্ল্যাকআউট শেষে পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ ফিরে এলে তারা ধারণ করা ছবি ও পর্যবেক্ষণের অংশ মাটিতে পাঠানো শুরু করবেন।
এখানে আরেকটি বড় বিষয় হলো, ওরিয়ন কোনো দিশাহীন ভাসমান ক্যাপসুল নয়। নাসার ভিজ্যুয়ালাইজেশন অনুযায়ী, আর্টেমিস–২ একটি free-return trajectory অনুসরণ করছে, অর্থাৎ পৃথিবী ও চাঁদের মহাকর্ষকে ব্যবহার করে এমন একটি পথ, যা স্বাভাবিকভাবেই মহাকাশযানকে নিরাপদে পৃথিবীর দিকে ফিরিয়ে আনে। তাই যোগাযোগ না থাকলেও মিশন থেমে থাকে না; নির্ধারিত পথ ধরে ওরিয়ন এগিয়ে যেতে থাকে।
নাসা এটাও মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, এ ধরনের ব্ল্যাকআউট একেবারে নজিরবিহীন নয়। অ্যাপোলো যুগেও এমন ঘটনা ঘটেছে, আর আর্টেমিস–১–এও অনুরূপ যোগাযোগ-বিচ্ছিন্নতা দেখা গেছে। ভবিষ্যতে এই সীমাবদ্ধতা কাটাতে নাসা চাঁদের চারপাশে relay satellites বসানোর পরিকল্পনা করছে, যাতে চাঁদের পেছন দিকেও অবিচ্ছিন্ন যোগাযোগ রাখা যায়।
সব মিলিয়ে, আর্টেমিস–২–এর এই ‘নীরব ৪১ মিনিট’ আসলে ভয়ের গল্প নয়; এটি প্রযুক্তি, কক্ষপথবিদ্যা, এবং মানব প্রস্তুতির এক অসাধারণ পরীক্ষা। পৃথিবী তখন ছোট হয়ে যাবে, সিগন্যাল থেমে যাবে, কিন্তু মিশন থামবে না। বরং সেই নীরবতার মধ্য দিয়েই মানুষ আরও একবার প্রমাণ করবে—পৃথিবীর সীমানা ছাড়িয়ে যাওয়ার সাহস এখন আর কল্পকাহিনি নয়, বাস্তব বিজ্ঞান।

আপনার মতামত লিখুন