প্রিন্ট এর তারিখ : ২৯ মার্চ ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৯ মার্চ ২০২৬
ইরানে যুদ্ধের ছায়া: সীমিত অভিযানের আড়ালে বড় সংঘাতের আশঙ্কা
মাসুদুর রহমান, সম্পাদক ||
ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতা নিয়ে বিশ্বজুড়ে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা মোটেই অমূলক নয়। যদিও এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ইরানে পূর্ণাঙ্গ স্থল অভিযান শুরু করেনি, তবু সামরিক প্রস্তুতি, কৌশলগত মোতায়েন এবং সীমিত অপারেশনের নানা ইঙ্গিত পরিস্থিতিকে অত্যন্ত সংবেদনশীল করে তুলেছে। সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হলো, “সীমিত অভিযান” নামের যে কোনো পদক্ষেপ খুব সহজেই বড় আকারের যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, ছোট পরিসরের সামরিক হস্তক্ষেপও দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে, আর সেই বাস্তবতা আজ আবারও সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।ইরানকে অনেকেই কেবল একটি আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে দেখলেও বাস্তবে দেশটি সামরিক ও কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত জটিল প্রতিপক্ষ। তাদের রয়েছে শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা, ড্রোন প্রযুক্তি, ভূগর্ভস্থ সামরিক অবকাঠামো এবং বিস্তৃত আঞ্চলিক প্রভাববলয়। ফলে ইরানের বিরুদ্ধে স্থল অভিযান মানে কোনো সহজ বা স্বল্পমেয়াদি যুদ্ধ নয়; বরং তা দীর্ঘ, ব্যয়বহুল এবং অনিশ্চিত সংঘাতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কাই বেশি। এ ধরনের যুদ্ধের পরিণতি শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তা মানবিক বিপর্যয়, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং আঞ্চলিক শক্তির নতুন সংঘাতে রূপ নেয়।এই সংকটের আরেকটি ভয়াবহ দিক হলো এর বৈশ্বিক প্রভাব। ইরান অঞ্চলগতভাবে এমন এক ভূ-কৌশলগত অবস্থানে রয়েছে, যেখানে সামরিক সংঘাত শুরু হলে হরমুজ প্রণালীসহ বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাই মারাত্মক চাপে পড়ে যেতে পারে। তেলের দাম বেড়ে যাওয়া, জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ধাক্কা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন সংকট—সবই তখন বাস্তব সম্ভাবনা হয়ে উঠবে। অর্থাৎ, এটি কেবল যুক্তরাষ্ট্র-ইরান দ্বন্দ্ব থাকবে না; এর অভিঘাত পৌঁছে যাবে ইউরোপ, এশিয়া, এমনকি উন্নয়নশীল দেশগুলোর সাধারণ মানুষের জীবনেও।যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও এই পথ মোটেই ঝুঁকিমুক্ত নয়। ইরাক ও আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, “দ্রুত সামরিক সাফল্য” প্রায়ই দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক ও সামরিক জটিলতায় পরিণত হয়। মার্কিন জনমত, রাজনৈতিক চাপ এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতা—সবকিছু বিবেচনায় নিলে নতুন আরেকটি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও বড় বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই ইরানে সম্ভাব্য স্থল অভিযান কেবল সামরিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি হবে এমন এক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, যার মূল্য দিতে হতে পারে বহু বছর ধরে।
সবচেয়ে বড় বিপদ লুকিয়ে আছে ভুল হিসাবের মধ্যে। একটি ভুল হামলা, একটি অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া, কিংবা একটি ভুল বার্তাই পুরো অঞ্চলকে সর্বাত্মক যুদ্ধে ঠেলে দিতে পারে। তাই এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সংযম, কূটনীতি এবং বাস্তববাদী রাজনৈতিক প্রজ্ঞা। যুদ্ধ শুরু করা যত সহজ, তা নিয়ন্ত্রণ করা এবং শেষ করা তত কঠিন। ইরানে স্থল অভিযান যদি সত্যিই শুরু হয়, তবে তা শুধু একটি দেশের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ হবে না; বরং তা মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা, বৈশ্বিক অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার ওপর এক ভয়াবহ আঘাত হয়ে দেখা দিতে পারে। এখনো সময় আছে—সংঘাতের আগুন আরও ছড়িয়ে পড়ার আগেই কূটনীতিকে শেষ সুযোগ দেওয়ার।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মাসুদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত এল টি কে নিউজ