প্রিন্ট এর তারিখ : ২৯ মার্চ ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৭ মার্চ ২০২৬
বিয়ের পর স্বামী-স্ত্রীর চেহারায় কেন আসে মিল? জানাল বিজ্ঞান
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ডেস্ক ||
বিয়ের কিছু বছর পর অনেক স্বামী-স্ত্রীকে দেখে আশপাশের মানুষ মজা করে বলেন—“দেখতে তো একেবারে ভাইবোনের মতো!” কথাটি শুনতে হালকা রসিকতা মনে হলেও, এর পেছনে রয়েছে বেশ কিছু বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা। মনোবিজ্ঞান, আচরণবিজ্ঞান ও জীববিজ্ঞানের বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, দীর্ঘদিন একসঙ্গে থাকা দম্পতির চেহারায় সময়ের সঙ্গে কিছুটা মিল তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, এটি কোনো রহস্যময় ঘটনা নয়; বরং দীর্ঘ সম্পর্কের মধ্যে গড়ে ওঠা অভ্যাস, অভিব্যক্তি, আবেগ ও জীবনযাপনের সম্মিলিত প্রভাব।মুখের অভিব্যক্তির মিলেই বদলে যায় চেহারার ছাপমানুষ স্বাভাবিকভাবেই কাছের মানুষের মুখভঙ্গি অনুকরণ করে। স্বামী-স্ত্রী যখন দীর্ঘদিন একসঙ্গে থাকেন, তখন তারা অজান্তেই একে অপরের হাসি, বিস্ময়, রাগ বা দুঃখ প্রকাশের ধরন অনুসরণ করতে শুরু করেন।ফলে মুখের নির্দিষ্ট কিছু পেশী একইভাবে বারবার ব্যবহৃত হয়। সময়ের সঙ্গে এই পুনরাবৃত্ত ব্যবহারের কারণে মুখে ভাঁজ, রেখা ও অভিব্যক্তির ধরনে মিল তৈরি হতে পারে। সহজভাবে বললে, দুজন মানুষ যদি বছরের পর বছর প্রায় একইভাবে হাসেন, তবে তাদের মুখের “এক্সপ্রেশন প্যাটার্ন” কাছাকাছি হয়ে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়।সঙ্গী বাছাইয়েও থাকে মিল খোঁজার প্রবণতামনোবিজ্ঞানে একটি পরিচিত ধারণা হলো assortative mating। এর অর্থ, মানুষ প্রায়ই নিজের মতো বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন মানুষকে সঙ্গী হিসেবে বেছে নেয়। এই বৈশিষ্ট্য হতে পারে মুখের গঠন, চোখ-নাকের ধরন, ত্বকের রং, সামাজিক পটভূমি, এমনকি আচরণগত ধরণও।অর্থাৎ, অনেক ক্ষেত্রে বিয়ের পর মিল তৈরি হয় না; বরং মিল শুরু থেকেই থাকে। সম্পর্ক যত এগোয়, সেই মিল তত বেশি চোখে পড়ে।একই জীবনযাপনও রাখে বড় প্রভাবদাম্পত্য মানে কেবল একটি সম্পর্ক নয়, বরং একটি ভাগাভাগি করা জীবনযাপন। একই ঘরে থাকা, কাছাকাছি রুটিনে চলা, একই ধরনের খাবার খাওয়া, একই পরিবেশে থাকা, এমনকি মানসিক চাপের ধরণে মিল—এসবই শরীর ও চেহারায় দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জীবনধারাগত এই সাদৃশ্য ত্বকের অবস্থা, ওজনের পরিবর্তন, বয়সের ছাপ এবং সামগ্রিক চেহারায় একধরনের কাছাকাছি ভাব তৈরি করতে পারে। ফলে সময়ের সঙ্গে দুজনের মধ্যে বাহ্যিক সাদৃশ্য আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।আবেগের সামঞ্জস্যও মুখে ফেলে ছাপদীর্ঘ দাম্পত্য সম্পর্কে এক ধরনের আবেগগত সামঞ্জস্য তৈরি হয়। একজন যেমনভাবে আনন্দ, দুঃখ, অস্বস্তি বা বিরক্তি প্রকাশ করেন, অন্যজনও ধীরে ধীরে সেই অভিব্যক্তির ছন্দের সঙ্গে মানিয়ে নেন। একে অনেকে emotional synchronization বলে থাকেন।এই আবেগীয় সামঞ্জস্যেরও বাহ্যিক প্রকাশ আছে। কারণ আবেগ প্রকাশের সঙ্গে মুখের পেশীর ব্যবহার সরাসরি জড়িত। তাই বছরের পর বছর একই ধরনের আবেগীয় প্রতিক্রিয়া মুখেও মিলের ছাপ তৈরি করতে পারে।গবেষণাও দিচ্ছে একই ইঙ্গিতবিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘদিন একসঙ্গে থাকা দম্পতিদের মধ্যে চেহারাগত সাদৃশ্য কিছু ক্ষেত্রে বাড়তে পারে। বিশেষ করে যেসব দম্পতি আবেগগতভাবে ঘনিষ্ঠ, সুখী এবং একে অপরের সঙ্গে বেশি সময় কাটান, তাদের ক্ষেত্রে এই প্রবণতা বেশি চোখে পড়তে পারে।গবেষকদের মতে, এটি অলৌকিক কিছু নয়। বরং মানুষের সামাজিক আচরণ, পরিবেশগত প্রভাব, অভ্যাস এবং আবেগীয় বিনিময়ের স্বাভাবিক ফলাফল।সব দম্পতির ক্ষেত্রেই কি এমন হয়?এর উত্তর হলো—না। সব স্বামী-স্ত্রীর ক্ষেত্রেই সমানভাবে এই মিল দেখা যাবে, এমন কোনো বাধ্যতামূলক নিয়ম নেই। কারও ক্ষেত্রে মিল খুব স্পষ্ট হয়, কারও ক্ষেত্রে প্রায় চোখেই পড়ে না। জেনেটিক বৈশিষ্ট্য, শারীরিক গঠন, জীবনযাপন, সম্পর্কের প্রকৃতি এবং ব্যক্তিগত অভ্যাস—সবকিছু মিলিয়েই এর মাত্রা নির্ধারিত হয়।শেষ কথাবিয়ের পর স্বামী-স্ত্রীর চেহারায় মিল চলে আসা নিছক লোকমুখের কথা নয়। এর পেছনে রয়েছে বাস্তব বৈজ্ঞানিক যুক্তি—একই অভিব্যক্তি, একই পরিবেশ, একই জীবনযাপন এবং অনেক সময় শুরু থেকেই থাকা মিলের সমন্বয়। তাই সময়ের সঙ্গে একে অপরের সঙ্গে চেহারায় কিছুটা সাদৃশ্য তৈরি হওয়া আসলে দাম্পত্য জীবনের এক স্বাভাবিক মানসিক-শারীরিক প্রতিফলন।ভালোবাসা, অভ্যাস আর সময়—কখনো কখনো মুখাবয়বেও লিখে দেয় সম্পর্কের গল্প।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মাসুদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত এল টি কে নিউজ