প্রিন্ট এর তারিখ : ০৭ এপ্রিল ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৬ এপ্রিল ২০২৬
গোপন চুক্তি, পরস্পরবিরোধী বক্তব্য এবং রাষ্ট্রীয় বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট
মাসুদুর রহমান, সম্পাদক ||
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি, রাষ্ট্রীয় স্বার্থ এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে জনগণের কাছে সবচেয়ে বেশি প্রত্যাশিত বিষয় হলো স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং সত্যভিত্তিক অবস্থান। কিন্তু সম্প্রতি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের বক্তব্যকে ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতাকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো গোপন চুক্তি নেই; যা কিছু আছে, তা আগেই প্রকাশ করা হয়েছে। বক্তব্যটি আক্ষরিক অর্থে সত্য বলেই ধরে নেওয়া যেতে পারে—কারণ এখন চুক্তির বিষয়বস্তু জনসমক্ষে এসেছে, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে, বিশ্লেষণ হয়েছে, এবং সমালোচনারও জন্ম দিয়েছে। কিন্তু প্রশ্নটি এখানেই শেষ হয় না। মূল প্রশ্ন হলো—চুক্তিটি যখন করা হয়েছিল, তখন কি তা জনসমক্ষে ছিল? নির্বাচিত সরকারের জন্য অপেক্ষা না করে, নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে তড়িঘড়ি করে এমন একটি চুক্তি সম্পাদন করা হলে, সেটি কার্যত কতটা স্বচ্ছ ছিল?সমালোচকদের দাবি, চুক্তিটি তখন পর্যন্ত গোপনই রাখা হয়েছিল। আরও গুরুতর অভিযোগ হলো, এটি গোপন রাখার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি নন-ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্টে (এনডিএ) সই করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। সে সময় বিএনপি ও জামায়াতের দায়িত্বশীল নেতারাও এ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা ছিল। ফলে এখন “গোপন কিছু ছিল না” ধরনের বক্তব্য অনেকের কাছেই বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে হচ্ছে না।বিতর্ক আরও গভীর হয়েছে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আরেক বক্তব্যকে কেন্দ্র করে। গেল মার্চে বাংলাদেশ সফররত যুক্তরাষ্ট্রের সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুরের সঙ্গে বৈঠকের পর তিনি বলেছিলেন, দেশের বড় দুই রাজনৈতিক দলের প্রধানদের সম্মতিতেই ওই চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু এর পরপরই জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক পোস্টে স্পষ্ট ভাষায় জানান, বিদেশিদের সঙ্গে কোনো চুক্তির বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকার তাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা করেনি। এখানেই তৈরি হয়েছে বড় ধরনের সাংঘর্ষিক অবস্থান।একদিকে সরকার বলছে রাজনৈতিক ঐকমত্য ছিল, অন্যদিকে একটি প্রধান রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতা বলছেন, কোনো আলোচনাই হয়নি। তাহলে প্রশ্ন উঠবেই—কার বক্তব্য সত্য? পররাষ্ট্রমন্ত্রী কি ভুল তথ্য দিয়েছেন, নাকি রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতার বক্তব্য বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না? রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এমন দ্বন্দ্বপূর্ণ বক্তব্য শুধু রাজনৈতিক বিতর্ক নয়; এটি নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ার সততা ও স্বচ্ছতা নিয়েও গভীর সংশয় তৈরি করে।এদিকে সিপিডির সম্মানিত ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের মন্তব্য এই বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তাঁর ধারণা, অন্তর্বর্তী সরকারের কিছু গোপন যুক্তি বা প্রতিশ্রুতির কারণেই রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কিনতে বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের অনুমতির বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হচ্ছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ দাবিকেও ‘মিথ্যা’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। কিন্তু শুধু “মিথ্যা” বলেই কি দায় শেষ হয়ে যায়? জনস্বার্থে জরুরি প্রশ্নের ক্ষেত্রে খণ্ডন যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন তথ্য, ব্যাখ্যা এবং প্রমাণভিত্তিক অবস্থান।রাষ্ট্র পরিচালনায় সবচেয়ে বড় পুঁজি হলো জনবিশ্বাস। সেই বিশ্বাস একবার নষ্ট হলে কেবল ভাষণ, অস্বীকার কিংবা পাল্টা অভিযোগে তা ফিরিয়ে আনা যায় না। বিশেষ করে পররাষ্ট্রনীতি, আন্তর্জাতিক চুক্তি, জ্বালানি নিরাপত্তা বা কৌশলগত সম্পর্কের মতো বিষয়ে অস্পষ্টতা জাতির জন্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হতে পারে। কারণ এসব বিষয়ে ভুল সিদ্ধান্তের মূল্য শেষ পর্যন্ত দিতে হয় পুরো দেশকেই।আজ সবচেয়ে জরুরি হয়ে উঠেছে একটি সরল কিন্তু মৌলিক প্রশ্ন: বাংলাদেশের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি ও কূটনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো কি জনগণের অগোচরে, রাজনৈতিক ঐকমত্য ছাড়াই, তাড়াহুড়ো করে নেওয়া হচ্ছে? যদি না হয়ে থাকে, তবে পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের ব্যাখ্যা কোথায়? আর যদি হয়ে থাকে, তবে সেটি কেবল রাজনৈতিক দায় নয়—এটি রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিরও একটি গুরুতর ব্যর্থতা।দায়িত্বশীল পদে থাকা মানুষদের প্রতিটি শব্দের ওজন আছে। তারা যদি এমন সংবেদনশীল বিষয়ে একে অপরকে ‘মিথ্যা’ বলার পর্যায়ে চলে যান, তবে জনগণ কাকে বিশ্বাস করবে? গ্রহণযোগ্যতা কেবল পদবির মাধ্যমে আসে না; আসে স্বচ্ছতা, সত্যনিষ্ঠা এবং জবাবদিহির মাধ্যমে। রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণী বিষয়ে সেই মানদণ্ডে যারা ব্যর্থ হন, তাদের প্রতি জনআস্থা টেকসই থাকে না।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মাসুদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত এল টি কে নিউজ